আজ, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কঠিন দিন হিসেবে লিখিত হয়েছে। দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলীয় বিশিষ্ট নেতা বেগম খালেদা জিয়া সকাল ৬টায় ঢাকা শহরের এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তিনি ৮০ বছর বয়সে দীর্ঘদিন রোগ ও চিকিত্সার পরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি একটি রাজনৈতিক দলে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দেশটির রাজনীতিকে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত করেছেন। তিনি বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীদের একজন হিসেবে বাংলাদেশে নির্বাচনী গণতন্ত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন। প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসেন এবং পরবর্তীতে কয়েকবার দেশের সর্বোচ্চ সরকারি পদে থেকেছেন।
তাঁর রাজনীতিক জীবন ছিল উত্থান-পতনের পরিচয়। ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ডের পর রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র নেতৃত্বে উঠে আসেন। তিনি সামরিক শাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০-এর গণআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে বাংলাদেশে নির্বাচনভিত্তিক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে আওয়ামীলীগ জোটের সাথে যুগপৎ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তার কার্যকাল বহুমাত্রিক ছিল। একদিকে তিনি নারীর ক্ষমতায়ন, প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং সামাজিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো উদ্যোগে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আরেকদিকে সরকারে থাকাকালিন শাসন, রাজনৈতিক সহিংসতা ও দলীয় বিরোধের কারণে সমালোচনাও হয়েছে। তার শাসনামলে রাজনৈতিক সহিংসতা, বিভাজন এবং বিরোধী সংঘর্ষের মতো ঘটনাও ঘটেছে, যার কারণে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ বহুবার উত্তপ্ত হয়েছে।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুধুমাত্র ক্ষমতার শিখরে ওঠা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ লড়াই, বাধা, জেলহাজতে থাকা, নিপীড়ন ও পুনরায় উত্থানের গল্পও। তিনি কয়েক বছর জেলেও ছিলেন এবং নানা সময়ে বিচারালয়ে মামলার সম্মুখীন হয়েছেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও ছিল। ২০২৫ সালে সেগুলোর বেশিরভাগ মামলায় তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা আদালত থেকে খালাস পেয়েছেন।
তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল শোক প্রকাশ করেছে। বিএনপি ৭ দিনের শোক ঘোষণা করেছে এবং দলের সহকর্মীরা ও অনুসারীরা খালেদা জিয়াকে ‘ন্যায়বিচারের প্রতীক’ ও ‘জনগণের নেত্রী’ হিসেবে স্মরণ করছে।
এদিকে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন এবং তাকে বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দুই নেতার দীর্ঘ রাজনীতিক সংঘাত বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায় তৈরি করেছে, যে অধ্যায় আজ তার সমাপ্তির প্রান্তে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যু শুধু এক ব্যক্তির না — এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবনে এক যুগের সমাপ্তি। যিনি সমর্থকদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক ছিলেন। অন্যদিকে সমালোচকদের কাছে শক্ত নাগরিক রাজনীতি ও দলীয় সংঘাতের একটি প্রতীকও ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতির গতিপথ এখন নতুন দিকনির্দেশ খুঁজছে।








Leave a Reply